বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ।Food safety management system in Bangladesh

খাদ্য দ্রব্যের ভেজাল বলতে কি বুঝ?

নিম্নমানের বা দূষিত কেমিক্যাল বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মিশানো কে খাদ্যে ভেজাল বলে। যারা অসুস্থ এবং অসাধু ব্যবসায়ী তারা বেশি লাভের আশায় এ ধরনের কাজ করে থাকে।  অনেক সময় খাদ্য আকর্ষণীয় করার জন্য অনেক ধরনের রং মেশানো হয়।

খাদ্য বাহিত রোগ
রোগের উৎপত্তি অনেক কারণে হতে পারে যেমন – দূষিত পরিবেশ, দূষিত পানি, জীবাণুুযুক্ত খাদ্য।

দূষিত পরিবেশ
দূষিত ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ থেকে স্যালমোনেলা, কমপাইলো, ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস ইত্যাদি খাদ্যে প্রবেশ করে। গৃহে, হোটেল- রেস্তরাতে, খাদ্য শিল্পে পণ্য উৎপাদনের সময় যাহাতে খাদ্য জীবাণু দ্বারা কন্টামিনেন্ট না হয় সে জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে পার্সোনাল হাইজিন ও কারখানাতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

 

খাদ্য বাহিত রোগ 

দূষিত পানিঃ
সাধারণত দূষিত পানিতে টাইফয়েড, ডায়রিয়া, কলেরা, হেপাটাইটিজ অ্যামিভিয়াস, কলিফরম প্রভৃতি জীবাণু থাকে। কারখানা/উৎপাদন স্থলে বিশুদ্ধ / নিরাপদ পানি ব্যবস্থা না থাকলে ঐ সব জীবাণু দ্বারা ভোক্তা আক্রান্ত হবে।

জীবাণুবাহিত খাদ্যঃ
অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থ্য প্রাণী থেকে দুধ সংগ্রহ করা হয়। উক্ত দুধে এন্টিবায়টিক সহ বিভিন্ন জীবাণূ থাকতে পারে। দুধে ফরমালিন থাকতে পারে। খোলা খাবার ইঁদুর, বিড়াল, মাছি, তেলাপোকা, বা অন্যান্য পতঙ্গ দ্বারা দূষিত হতে পারে। অসুস্থ্যকর্মী (সর্দি, কাশি, চর্মরোগ, হ্যাঁপানী রোগে আক্রান্ত) দ্বারা খাদ্য তৈরি/ পরিবেশনে খাদ্যে জীবাণুযুক্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য পরিবেশকের অপরিষ্কার হাত / নখ দ্বারা দূষিত হতে পারে।

খাদ্য বাহিত রোগ প্রতিরোধ 

ভালফল, খাদ্য, পানীয় দ্রব্য বা রান্নাকরা খাদ্যকে পঁচা ফল, বাসি খাদ্য, দূষিত পানি এবং কাচাঁ খাবার থেকে অন্যত্র স্থানে স্বতন্ত্রীকরণ
পার্সোনেল হাইজিন বা জনস্বাস্থ্য মূলক শিক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণদান এবং মেনে চলা।
খাদ্য দ্রব্য তৈরি ও সংরক্ষণের স্থান পরিষ্কারকরণ ও জীবাণু নাশক করণ।
অসুস্থ্যকর্মীকে কাজে নিযুক্ত না করা।
মাংস, দুধ, ডিম সঠিক ভাবে কুকিং করা।
বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা।
সঠিক তাপমাত্রায় খাদ্য সংরক্ষণ করা।

শিল্প পণ্য 
শিল্প পণ্য বলতে কারখানা বা যে কোন শিল্পে প্রয়োজনীয় কাচাঁমাল প্রক্রিয়াজাতকরনের মাধ্যমে নতুন কিছু তৈরী করা ও ভোক্তা সাধারনের ব্যবহারের উপযোগী করাকে বুঝায়। খাদ্যপণ্য মানসম্মত, সুস্বাদু , নিরাপদ, ক্ষতিকর রায়সায়নিক পদার্থ মুক্ত ও প্যাথোজেনিক মাইক্রো অর্গানিজম মুক্ত হতে হবে।

বাংলাদেশে তিন শ্রেনীর খাদ্য শিল্প রয়েছেঃ
বৃহৎ শিল্প পণ্য: কার্বনেটেড বেভারেজ, মিল্ক ও মিল্ক প্রোডাক্টস, আয়োডিনযুক্ত লবন, ফ্রুট জুস ইত্যাদি।
মাঝারি শিল্প পণ্য: অটোমেটিক বা সেমি অটো ব্রেড ও বিস্কুট ফ্যাক্টরী, ড্রিংকিং ওয়াটার, রেস্তোরা ,নুডুলস, চিপস, মসলা ইত্যাদি।
ক্ষুদ্র শিল্প পণ্য: মেকানিক্যাল বা কনভেনশনাল সিস্টেমের চানাচুর, পাউরুটি, লাচ্ছা সেমাই, বিস্কুট, কেক, সস, জ্যাম, জেলী ইত্যাদি। এদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত বিস্কুট, মসলা, ঘি, জ্যাম, জেলী, সস, মুড়ি, মধু, লাচ্ছা সেমাই ইত্যাদি বাংলাদেশের মানের পাশাপাশি আর্ন্তজাতিক মান সনদ  লাভ করেছে। তাদের পণ্য দেশের বাইরেও রপ্তানী হচ্ছে।

Food safety management system in Bangladesh

ফূড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম একটি খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেখানে একটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ব্যবস্থা কে সামগ্রিকভাবে যাচাই করা হয়। বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক সনদ পেতে হলে ফূড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম পুরোপুরি জানতে হয়, তাছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা খাদ্য আইন অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনা জন্য এই সনদ গ্রহণ করতে হয়।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা কি

কাচাঁমাল এবং পণ্যের মাননিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা থাকা।
খাদ্যে ক্ষতিকারক  পদার্থ অবশ্যই গ্রহনযোগ্য মাত্রার নিচে নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদনের জন্য নিজস্ব গাইডলাইন বা ম্যানুয়াল তৈরী করা।
প্রয়োজনীয় জাতীয়মান/আর্ন্তজাতিকমান সনদ
জনবলকে প্রশিক্ষিত করা।

খাদ্যে ভেজাল রোধে করণীয়

বাংলাদেশ মানের পণ্য তৈরী ও বাজারজাত করণ।
স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে নিরাপদ খাদ্যপন্য তৈরীকরন, বিক্রয় ও বিতরন।
ভোক্তা সাধারনের সন্তুষ্টি ও অধিকার সংরক্ষন (অর্থাৎ মেয়াদ উর্ত্তীনের সাথে সাথে পন্য বাজার থেকে তুলে নেওয়া এবং প্যাকেট বা মোড়কে প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ করা)
বি এস টি আই অধ্যাদেশ, ডি সি সি এ্যাক্ট ও বাংলাদেশ বিশুদ্ধ খাদ্য আইন এবং ফুডস সঙ্ক্রান্ত রেগুলেশন মেনে চলা।

ভোক্তা সাধারনের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন বেকিং খাদ্য পণ্য সরবরাহ ও উৎপাদনে সামর্থ অর্জন
বাজারজাতকরণে নতুন কৌশল সৃষ্টি।
প্রশিক্ষনের মাধ্যমে উৎপাদন কর্মীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি
দেশীয় মানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান সনদ (ISO) গ্রহনের যোগ্যতা সৃষ্টি।

কারখানার কাঠামো
পর্যাপ্ত স্থান, যন্ত্রপাতি, সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকা।
পর্যাপ্ত পানি ব্যবহারের সুযোগ ও মেইনটেসেন্সের ব্যবস্থা থাকা।
মশা, মাছি, পোকা, ইঁদুর, পাখী, প্রবেশ প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করণ।
পর্যাপ্ত লাইটিং এবং ভেন্টিলেশন সুবিধা থাকা।
ওয়াল মসৃন এবং হালকা রংয়ের পেইন্ট করতে হবে।
প্রসেসিং এর জন্য পর্যাপ্ত স্থান ।
ফ্লোর, ওয়াল সহজে পরিস্কার করার উপযোগী থাকা ।
অভ্যন্তরের দেয়াল সাদা বা হালকা রং এর থাকা উচিত ।

কাচাঁমালের গোডাউন, মিক্সিং, প্রসেসিং, কার্টিং / বেকিং, প্যাকেজিং এবং ফিনিস প্রোডাক্টস (উৎপাদন) এর জন্য পৃথক পৃথক ্এরিয়া থাকা ।
ব্ইারের সাথে প্রসেসিং / উৎপাদন এরিয়াকে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ না থাকা।
পর্যাপ্ত লাইটিং সুবিধা।
প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশন সুবিধা ও জালি নেট যুক্ত জানালা।
মাছি, তেলাপোকা, ইঁদুর ইত্যাদির প্রবেশ প্রতিরোধক ব্যবস্থা।
প্রসেসিং ইউনিটের সাথে টয়লেট সরাসরি সংযুক্ত থাকা যাবে না।

মসৃন বা সহজে পরিষ্কার যোগ্য ফ্লোর হতে হবে।
ধুয়া নিগর্মণের ব্যবস্থা থাকা।
দেয়াল, ফ্লোর সহজে পরিষ্কার যোগ্য হতে হবে।
বর্জ্য নির্গমন এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকা (প্রয়োজনে ভিন্ন গেট/ দরজা ব্যবহার করা)।
প্রসেসিং /কুকিং ইউনিটের সাথে টয়লেট রাখা যাবে না।
চামচ, বাকেট, ডিস, কন্টেইনার, প্লেট ও গ্লাস ইউটেনসিল ইত্যাদি পরিষ্কার দ্রব্য সঠিক স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে।

পার্শ্ববর্তী এলাকা
ধুলাবালি মুক্ত।
দুর্গন্ধ মুক্ত।
বর্জ্য ও পয়:নিস্কাশন ব্যবস্থা থাকা।

incoming goods

পানি, সকল কাচাঁমাল, সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মানের (বিডিএস ) হতে হবে।
ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ (এ্যান্টিবায়োটিক, পেস্টিসাইডস, হেভি মেটাল, আফলাটকসিন) মুক্ত হতে হবে।
অন্য ক্ষতিকর দ্রব্যের সাথে কন্টামিনেশন মুক্ত।
প্যাকেজিং দ্রব্যাদি ফুড গ্রেড হতে হবে (প্রয়োজনে সাপ্লাইয়ার থেকে সনদ গ্রহন করতে হবে)
ফুড এডিটিভস (রং, ফ্লেভার, প্রিজারভেটিভ) সমূহ ফুড গ্রেড (আন্তর্জাতিক কোড নং / ঈড়ফব ঘড়.যুক্ত) হতে হবে ।

storage

সঠিকভাবে পরিস্কার করা।
অপেক্ষাকৃত শুস্ক ও কম তাপমাত্রা নিশ্চিত করা।
অপ্রয়োজনীয় লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা ।
দরজা বন্ধ রাখা।
শুস্ক ও ভিজা কাচাঁমাল পৃথকভাবে রাখা।
কাচাঁমাল সমূহ ফ্লোর থেকে উচুতে এবং দেয়াল থেকে কমপক্ষে ৬ ইঞ্চি দুরে কাঁঠের প্লেটের উপর সংরক্ষন করা।
প্রত্যেক কাচাঁমালের লেবেলিং / মার্কিং করা।
ফিফো (ঋওঋঙ) সিস্টেমে ব্যবহার করা।

personal hygiene

সংশ্লিষ্ট কাজের উপযোগী ও দক্ষ হতে হবে।
কারখানার পরিস্কার পোশাক পরিধান করতে হবে ।
খারাপ অভ্যাস (যেখানে সেখানে থুথু ফেলা, গা চুলকানো ইত্যাদি) পরিত্যাগ করা।
সর্দি, কাশি, চর্মরোগ, হাঁপানী, যক্ষা রোগ বহনকারী কর্মীকে কাজ থেকে বিরত করা।
প্রয়োজনে গোসল, হাত ধোয়াার সাবান ও এন্টিসেপটিক ব্যবহার নিশ্চিত করা ।

machine and utensils

নন করোসিভ (অবক্ষয় মুক্ত)
সহজে হ্যান্ডেলিং যোগ্য।
ক্যালিব্রেটেড (থার্মোমিটার বা গেজ থার্মোমিটার, প্রেসার মিটার, ব্যালেন্স, ওভেন / তন্দুর ইত্যাদি)।
যথাযথ পরিস্কার রাখা।
প্যাকেজিং দ্রব্যাদি পরিস্কার রাখা এবং কন্টামিনেশন মুক্ত করা।
স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে প্যাকেজিং ও সিলিং করা ।
মেশিন অপারেশনে ঝঙচ(স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর) মেনে চলা

প্যাকেজিং , লেবেল ও মার্কিং
পণ্যের নাম ব্রান্ড উপাদান উৎপাদনকারীর নাম ও প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা থাকা।
ওজন, মূল্য, উৎপাদন তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণ তারিখ, ব্যাচ নম্বর থাকা (প্রয়োজনে) ।
স্ট্যান্ডার্ড মার্ক বা মান চিহ্ন ব্যাবহার করা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
ফুডগ্রেড প্যাকেজিং দ্রব্যাদি (যা পরিবেশ আইনে অপরাধ নয়)।

ভেরিফিকেশন এবং টেষ্টিং সুবিধা:
ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা  থাকতে হবে।
টেষ্ট রির্পোট রেকর্ড কিপিং থাকতে হবে।
যথাযথ যন্ত্রপাতি থাকতে হবে।
রিয়েজেন্ট ও ইন্সট্রুমেন্ট ক্যালিব্রেশন  করতে হবে।
সোয়াব টেষ্ট
পেষ্ট কন্ট্রোল রেকর্ড থাকতে হবে।

Leave a Comment