পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনা

উৎপাদন ব্যবস্থাপনার অর্থঃ

উৎপাদনঃ
উৎপাদন বলতে কোন পণ্য বা বস্তু প্রস্তুত করাকে বুঝায়। বাস্তবে মানুষ কোন বস্তু বা পদার্থ সৃষ্টি করতে পারে। পদার্থ প্রকৃতির দান। মানুষ শুধুমাত্র প্রকৃতি প্রদত্ত পদার্থে অতিরিক্ত উপযোগ সংযোগ করে একে অধিকতর ব্যবহারোপযোগী করতে পারে। প্রকৃতি প্রদত্ত পদার্থে এই প্রকার অতিরিক্ত উপযোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়াকেই অর্থনীতির ভাষায় উৎপাদন বলে। মানুষ তার জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, কর্মশক্তি ও কারিগরী দক্ষতার প্রয়োগে প্রাকৃতিক পদার্থে অতিরিক্ত উপযোগ সংযোজনের মাধ্যমে একে অধিকতর জন কল্যাণে নিয়োগ করে থাকে।

কাজেই, আনুক্রমিক কারিগরি প্রক্রিয়ায় দক্ষ শ্রমিক কর্মীদের মানসিক ও দৈহিক শ্রম দ্বারা প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদের আকার, আয়তন ও গুণ বা উৎকর্ষের পরিবর্তন করে উপযোগী দ্রব্যে বা পণ্যে রুপান্তরকরণকে উৎপাদন বলা হয়। আর উৎপাদনের মাধ্যমে যাহা তৈরী করা হয় তাহাই উৎপাদ বা পণ্য বা সেবা।

ব্যবস্থাপনাঃ

এতক্ষণ আমরা “ উৎপাদন” সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। অপর পক্ষে “ব্যবস্থাপনা” হলো কালা বা কৌশল যা সমগ্র কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সাহায্য করে। ব্যবস্থাপনার কার্যাবলীর মধ্যে পরিকল্পনা, সংগঠণ, কর্মীসংস্থান বা ষ্ট্যাফিং, নির্দেশনা-নেতৃত্বে, যোগাযোগ, প্রেষণা ও তত্বাবধান, সমন্বয় সাধন, রিপোর্ট অথবা রেকর্ডকরণ, বাজেট প্রনয়ন এবং নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্য।

অতএব উৎপাদন ব্যবস্থাপনা হলো ব্যবস্থাপনার সে অংশ যা উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে কাঁচামাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদনের সহায়ক বিভিন্ন কার্যাবলী গ্রহণ এবং প্রতিৃয়ার সুষ্ঠ পরিচালনার জন্য তত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পূর্ভ পরিকল্পিত পণ্য কিংবা সেবা প্রস্তুত করা।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি যে, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এ রূপ একপ্রকার ব্যবস্থাপনা যা সুষ্ট পরিকল্পনা ও পরিচালনার দ্বারা শিল্প প্রতিষ্ঠানের সে অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে যা কাঁচামালকে চুড়ান্ত পণ্যে রূপান্তরিত করার কাজে নিয়োজিত।

উৎপাদন ব্যবস্থাপনার আওতাঃ

উৎপাদন ব্যবস্থাপনা শিল্প প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার আওতাভূক্ত এক প্রকার বিশেষায়িতব্যবস্থাপনা যা পণ্য উৎপাদন তদারককরণ ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত। শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনা ও প্রতিষ্ঠিত লক্ষ্যেরর সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে উৎপাদন ব্যবস্থাপনার কার্যাবলী পরিচালিত হয়।

উৎপাদন ব্যবস্থাপনার পরিধি বা আওতা নিম্নবর্ণিত কার্যাবলীর মধ্যে পরিব্যাপ্তঃ

(১) পণ্যের ডিজাইনকণ।
(২) উৎপাদন প্রশাসন-উৎপাদন ইঞ্জিনিয়ারিং, উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণনয়ন ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রনের কার্যাবলী।
(৩) উৎপাদন প্রক্রিয়া নির্ধারণ।
(৪) কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, কারিগরী প্রভৃতির সরবরাহ ও প্রাপ্তব্যতা নির্ধারন বা উৎপাদন পরিকল্পনার লজিষ্টিক্স নির্ধারণ।
(৫) উৎপাদন বা রুপান্তর প্রক্রিয়া পরিচালনা এবং কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয় সাধন।
(৬) উৎপাদন নিয়ন্ত্রন-রুটিং, সিডিউল, ডিসপ্যাচিং, অনুগমন।
(৭) কার্যেরমান বা পরিনত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ
(৮) উৎপাদন কার্যাবলী পরিচালনা ও এদের মধ্য সমন্বয় সাধন।
(৯) উৎপাদন সাথে জড়িত ও নির্ভরশীল কার্যাদি সম্পাদন।
(১০) কারিগর ও শ্রমিক-কর্মীদের নির্দেশনা ও প্রেষণদান এবং তাদের মনোবল সৃষ্টি।
(১১) সৌহার্ধপূর্ণ শিল্প সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুস্থ্য কারখানা পরিবেশ সংরক্ষণ।
(১২) কলকব্জা, ইমারত ইত্যাদি রক্ষনাবেক্ষণ।
(১৩) পরিনত পণ্য বাজারজাতকরণের উপযোগীকরণ ও প্যাকরণ।
(১৪) প্রয়োজনবোধে বিক্রয়োত্তর সেবা পরিবেশন।

বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বিশেষত  দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকে অদ্যাবধি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অকল্পনীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে বৈপ¬বিক বিবর্তন সাধিত হয়েছে। কম্পিউটার, রবোট ও স্বয়ংক্রিয়তার ব্যাপক ব্যবহারের ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া সূক্ষ্ম ও জটিলতার আকার ধারণ করেছে। গতিশীল উৎপাদন ব্যবস্থাপনাও সেই সঙ্গে জটিলতর হয়ে চলেছে। আধুনিক বিশ্ববাজারে সুতীব্র প্রতিযোগীতার অস্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রচার ও বিজ্ঞাপনের চাইতেও উৎপাদন উৎকর্ষতা বিধানের মাধ্যমে বাজার দখলের প্রচেষ্টা ব্যাপকতর হয়েছে। পণ্য উন্নয়ন, ডিজাইন পরিবর্তন, উদ্ভাবন ও নতুনত্ব বিধানের প্রতিযোগিতা তীব্রতর হয়েছে। উৎপাদন ব্যবস্থাপনার আওতাও তাই দিন দিন ব্যাপকতর হয়ে চলেছে।

উৎপাদন ব্যবস্থাপনার কার্যাবলীঃ

উৎপাদন ব্যবস্থাপনার কার্যাবলীর পরিধি সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। উৎপাদনের পরিকল্পনা প্রণয়ন, উৎপাদন কার্য পরিচালনা উপকরণাদি ও কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয় সাধন, উৎপাদনের মনুষ্য উপাদান বা শ্রমিকদের প্রনোদন যোগানো, উৎপাদন নিয়ন্ত্রন কার্যাবলী উৎপাদন ব্যবস্থাপনার আওতাভূক্ত। আধুনিক যুগে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থাপনার জটিলতাতার আকার ধারন করেছে। কি উৎপাদন করা হবে ? কিরুপে উৎপাদন করা হবে ? উৎপাদনে কি কি উপকরণ লাগবে ? উৎপাদন পরিকল্পনা কিরুপ হবে ? উৎপাদন পদ্ধতি কিরুপ হবে ? শ্রমিক-কর্মীদেরকে কিরুপে পরিচালনা করতে হবে ? তাদেরকে শ্রেষণাদানের জন্য কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ? পণ্যমান কি রুপ হবে ? মান নিয়ন্ত্রণ কিভাবে করতে
হবে ? এসব বিষয়ে উৎপাদন ব্যবস্থাপনাকে বাস্তব কর্মসূচী ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়।

ক্ষুদ্র কিংবা বৃহদায়তন সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানেই ক্রমবর্ধমান উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা নিম্নোক্ত কাজগুলো সম্পাদন করে থাকে

(১) সম্পদ ও ক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার
(২) পণ্য ও যন্ত্রপাতির ডিজাইন নির্ধারন
(৩) উৎপাদন পরিকল্পনা
(৪) কার্য সমীক্ষা
(৫) উৎপাদন পদ্ধতি সমীক্ষা
(৬) উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ
(৭) মজুতমাল নিয়ন্ত্রণ
(৮) যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ
(৯) দ্রব্য গবেষণা ও উন্নয়ন
(১০) উৎপাদন কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি
(১১) সমন্বয় সাধন
(১২) প্রশিক্ষণ এলকা নির্ধারণ উৎপাদন বাজেট প্রণয়ন
(১৩) ব্যয় হ্রাস
(১৪) যন্ত্রপাতি বিন্যাস
(১৫) অর্থনৈতিক উন্নয়ন উৎপাদন বৃদ্ধি অর্থ জাতীয় আয় বৃদ্ধি। উৎপাদন ব্যবস্থাপনা উৎপাদন বিভাগের কর্মকান্ড স্বাভাবিক রেখে উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। ফলে অধিক পরিমানে দ্রব্য যথাসম্ভব কম ব্যয়ে উৎপাদন করা যায়। এতে ভোক্তা উৎপাদনকারী উভয়ই উপকৃত হয়ে থাকে। এ ছাড়া উৎপাদন ব্যবস্থাপনা উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহ এবং কারখানা স্থান নির্বাচনে সহায়তা করে থাকে।

উৎপাদন ও উৎপাদনে বিনিয়োগকৃত অর্থের ব্যবস্থাপনায় বিবেচ্য দিকসমূহ:

  • নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনে কর্মী/শ্রমিকের দক্ষতা।
  • কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রতিষ্ঠানের করণীয়।
  • কর্মীর যে বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ বেশি সে কাজে নিয়োগদান।
  • কর্মীর যে বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ বেশি সে কাজে নিয়োগদান।
  • কর্মীর বিভিন্ন গুণাবলীকে প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহার করা।
  • একই কর্মীকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়ে সময় ও অর্থের সাশ্রয়।
  • কম কর্মী/শ্রমিক দিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি পণ্য উৎপাদন।
  • পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সহজীকরণ।
  • নতুন প্রযুক্তির সাথে দ্রুত খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা।
  • উৎপাদন খরচের খাতগুলো চিহ্নিত করে ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা করা।
  • সকল খরচের খাতগুলো চিহ্নিত করা ও মোট উৎপাদন খরচে সবগুলো খাত অন্তর্ভুক্ত করা।

তত্ত্ববধানের ক্ষেত্রে করণীয় কাজগুলো হলোঃ

  • সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে দেয়া।
  • লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে কিনা তদারক করা।
  • ভাল কাজের প্রশংসা করা।
  • আরো বেশি পণ্য উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা।
  • প্রয়োজনে মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার করা।
  • কাজের মান অনুযায়ী আর্থিক অনুদান/পদোন্নতি বা অন্যান্য পুরস্কার প্রদান করা।

একটি ব্যবসায় পণ্য উৎপাদনে বড় সমস্যা হলো কাঁচামালের অপচয়। অপচয় রোধের ক্ষেত্রে করণীয় পদক্ষেপগুলো হলোঃ

  • পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ক্রয়।
  • কাঁচামালের যথাযথ স্টক রক্ষণাবেক্ষণ করা।
  • কাঁচামাল ব্যবহারের হিসাব নেয়া।
  • একই কাঁচামালের বহুবিধ ব্যবহার।
  • কাঁচামাল ব্যবহারের সময় যথাযথ তত্ত্বাবধান।

কাঁচামাল ক্রয়ে বিবেচ্য বিষয়ঃ

  • কম দামে কাঁচামাল ক্রয়।
  • কাঁচামাল ক্রয়ের বিকল্প বাজার।
  • কাঁচামালের বৈচিত্রতা।
  • বিভিন্ন কাঁচামালের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান।
  • কাঁচামাল ক্রয়ে ব্যবসাীয়র নিজের সম্পৃক্ততা।

–        আমরা জানি কাঁচামাল ক্রয়ে যদি লাভ করা যায় অর্থাৎ তুলনামূলক কমদামে ক্রয় করা যায় তাহলেই কেবলমাত্র পণ্যের বর্তমান মূল্য ঠিক রেখে লাভ বেশি করা যায়। এজন্য একই পাইকারী কাঁচামাল বিক্রেতার দোকান হতে ক্রয় না করে মাঝে মাঝে অন্য কোন দোকান হতে ক্রয় করা বা যাচাই করে কাঁচামাল ক্রয় করা উচিত।

–        এখানেই আসে কাঁচামাল ক্রয়ের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা। গ্রামে বা মফস্বলে যে কাঁচামালের দাম বেশি সেই একই জিনিসের দাম জেলা শহর কিংবা রাজধানীর বাজারে অনেক কম। এক্ষেত্রে, কয়েকজন পণ্য উৎপাদনকারীর কাঁচামাল ক্রয়ের দায়িত্বে যদি একজনকে দেয়া হয় তাহলে ক্রয়মূল্য তুলনামূলকভাবে অনেক কম পড়বে।

–        কাঁচামালের বৈচিত্রতা ও সামঞ্জস্যতা বলতে আমরা উদাহরণ হিসাবে আলোচনা করতে পারি কাপড়ের রং ও সুতার মানের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বিধান। রং, সুতার মান, ডিজাইন ইত্যাদির ক্ষেত্রে ছোট বাজারের তুলনায় বিভাগীয় ও রাজধানীর বড় বাজারগুলোই অনেক বেশি সুবিধাজনক।

85 / 100

2 thoughts on “পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনা”

Leave a Comment