কারখানা বা প্রকল্পের স্থান নির্বাচন: (Plant or project site  selection)

ভূমিকা: উৎপাদনের জন্য এমন জায়গায় কারখানা স্থাপন করা উচিত যেন পণ্য বা সেবার উৎপাদন অর্থনৈতিক হয়। তাছাড়া কারখানা স্থাপনের পর পরিবর্তন খুব সহজ ব্যাপার নয়। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনার পক্ষে স্থান পরিবর্তন বিভিন্ন কারণে সম্ভব নাও হতে পারে। কারখানার স্থান নির্ধারণ করার পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদানসমূহকে ভালভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। উৎপাদন ও বিতরণ খরচের সাথে কারখানার স্থানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, ফলে বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য কারখানার স্থান নির্বাচন ব্যবস্থাপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। তাই প্রতিষ্ঠানকে তার কায়িক উপকরণ যেমন -কাঁচামাল, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ এবং উৎপাদিত পণ্যের ভাড়া, বাজারের অবস্থান ইত্যাদির তুলনামূলক সুবিধা বিবেচনা করে স্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

কারখানার স্থান নির্বাচনে বিবেচ্য উপাদানসমূহ:
কারখানার স্থান নির্বাচনে ব্যবস্থাপনা দুটি বিকল্প সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়ে থাকেন। একটি হচ্ছে জমি এবং দালান ক্রয় অথবা জমি ক্রয় করে দালান নির্মাণ, অপরটি হলো দালান ভাড়া নেয়া। উভয়েরই বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে, যেমন – ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যস্থল ভাড়া নেয়া অত্যন্ত ফলপ্রসূ। বড় আকারের প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি এবং দালান ক্রয় সবচাইতে উত্তম। তবে দৃষ্টি রাখতে হবে কার্যক্রম যদি এমনই হয়, যে জন্য বিশেষ ধরণের স্থান বিন্যাসের প্রয়োজন, তবে প্রতিষ্ঠানের আকার যাই হউক না কেন জমি ক্রয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী দালান তৈরী করে নেয়া সবচেয়ে সমীচীন। উপরোক্ত সিদ্ধান্তের পর ব্যবস্থাপক পর্যায়ক্রমিকভাবে তিনটি বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন।
এগুলো হচ্ছে-
০১। অঞ্চল নির্বাচন (ঝবষবপঃরড়হ ড়ভ ৎবমরড়হ)
০২। জনবসতি এলাকা নির্বাচন (ঝবষবপঃরড়হ ড়ভ ঈড়সসঁহরঃু)
০৩। নির্দিষ্ট স্থান নির্বাচন (ঝবষবপঃরড়হ ড়ভ ঝঢ়বপরভরপ ংরঃব)

নিম্নে প্রতিটি বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

(১) অঞ্চল নির্বাচনে বিবেচ্য উপাদানসমূহ:
নতুন কারখানার অঞ্চল নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপককে কতিপয় উপাদান বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হয়। এসব উপাদানগুলো হচ্ছে ঃ
ক) বাজারের নৈকট্য ;
খ) কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির নৈকট্য ;
গ) পরিবহনের পর্যাপ্ত সুযোগ ;
ঘ) আঞ্চলিক দক্ষ শ্রমিকের সমাবেশ ;
ঙ) পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, পানি এবং জ্বালানীর সহজলভ্যতা ;
চ) আঞ্চলিক মজুরী হারের বিভিন্নতা ;
ছ) সন্তোষজনক আবহাওয়া ;
জ) আঞ্চলিক জনসংখ্যা, সম্পদ এবং আয়।

(২) জনবসতি এলাকা নির্বাচনে বিবেচ্য উপাদানসমূহ:
জনবসতি এলাকা নির্বাচন অঞ্চল নির্ধারণের উপর নির্ভরশীল। কারণ অঞ্চলের মধ্যে এবং বৈশিষ্ট্যের বেড়াজালেই জনবসতি অবস্থিত। জনবসতি এলাকা নির্বাচনের উপাদানসমূহ সংখ্যায় অধিক তবে আপেক্ষিক গুরুত্ব খুবই পরিবর্তনশীল। সুতরাং নিম্নে বর্ণিত উপাদানসমূহ গুরুত্ব অনুযায়ী সাজানো সম্ভব নয়।
ক) পর্যাপ্ত শ্রমিক সরবরাহ ;
খ) প্রচলিত মজুরী হার ;
গ) শিল্প এবং শ্রমিক ধারনা ;
ঘ) বসতি এলাকায় অবস্থিত শিল্পের বৈশিষ্ট্য ;
ঙ) আইন এবং করের সীমাবদ্ধতা ;
চ) বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সরবরাহ এবং আবর্জনা নিষ্কাশন ব্যবস্থা ;
ছ) পর্যাপ্ত পুলিশ এবং অগ্নি নির্বাপনের ব্যবস্থা ;
জ) জন-এলাকায় বসবাসের অবস্থা ;
ঝ) জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার বর্ধিত হার ;
ঞ) এলাকাবাসীর আয় এবং ক্রয় ক্ষমতা ।

(৩) কারখানার নির্দিষ্ট স্থান নির্বাচনে বিবেচ্য উপাদানসমূহ:
অঞ্চল এবং জনবসতি এলাকা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট স্থান নির্বাচন সম্ভব নয়। ব্যবস্থাপক নির্দিষ্ট স্থান নির্বাচনে নিম্নলিখিত উপাদানসমূহকে বিবেচনা করে থাকে:
ক) জমির আকার ;
খ) পরিবহন ব্যবস্থা ;
গ) পুলিশ ও অগ্নি নির্বাপক কেন্দ্র, হাসপাতাল, আবাসিক ও ব্যবসা কেন্দ্রের নৈকট্য ;
ঘ) পর্যাপ্ত পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ এবং যোগাযোগের ব্যবস্থা ;
ঙ) খাওয়ার স্থানের নৈকট্য ।

কারখানার স্থান নির্বাচনের থিওরী:

পরিশেষে আমরা কোন শিল্প কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রখ্যাত জার্মান অর্থনীতিবিদ মিঃ আলফ্রেড ওয়েবার এর থিওরী বা মতবাদটি বিবেচনা করতে পারি। তিনি কোন শিল্প কারখানা স্থাপনের মানদন্ড নিরুপন করতে গিয়ে বলেছেন, যে স্থানে মোট পরিবহন ব্যয় সর্বনিম্ন, সেখানেই শিল্প স্থাপন লাভজনক। পরিবহন ব্যয় বলতে তিনি বুঝিয়েছেন যে, কাঁচামালের উৎপাদন কেন্দ্র হতে শিল্প-কারখানায় আনার জন্য পরিবহন এবং উৎপাদিত পণ্য বাজার পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়। এই মতবাদকে আমরা সন্নিকটবাদও বলতে পারি। অর্থাৎ শিল্প স্থাপনের জন্য যে সমস্ত উপাদান প্রয়োজন, উহার সন্নিকটেই শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া লাভজনক।

কারখানার স্থান নির্বাচন প্রক্রিয়া:

কারখানার অবস্থান নির্বাচনে যে সমস্ত উপাদান বিবেচনা করার প্রয়োজন হয় সেগুলি বিশ্লেষণ করে একজন শিল্পোদ্যোক্তা কেবলমাত্র কয়েকটি সম্ভাব্য স্থানের সন্ধান পেয়ে থাকেন। এ সকল সম্ভাব্য স্থানগুলি কমবেশী সকল উপাদান দ্বারাই সমৃদ্ধ। তবে একজন শিল্পোদ্যোক্তার নিকট সবচেয়ে বড় সমস্যা কিভাবে তিনি এসব বিকল্প স্থানগুলি থেকে একটি লাভজনক ও সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করবেন। কারখানার সুবিধাজনক অবস্থান নির্বাচন করার জন্য ব্যবস্থাপকগণ বিভিন্ন স্থানের উপাদানসমূহের ব্যয় হিসাব করার জন্য অবস্থান ব্যয় সারমর্ম তালিকা ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন উপাদানের ব্যয় হিসাব করার জন্য উৎপাদনের পরিমান পূর্বেই ঠিক করা হয়। মোট উৎপাদনের পরিমান দ্বারা প্রতিটি উৎপাদনের ব্যয়কে ভাগ করলে প্রতি একক বাবদ ব্যয় বাহির হবে। এভাবে প্রতিটি উৎপাদনের ব্যয় বাহির করার পর একটি অবস্থানের মোট ব্যয় নির্ধারিত হয়। সম্ভাব্য সকল স্থানের ব্যয় নির্ধারিত হবার পর তুলনামূলকভাবে যে অবস্থানের মোট ব্যয় কম হবে সেখানেই কারখানার অবস্থান নির্বাচিত হবে।

Write A Comment